গণমাধ্যম দমনের ইতিহাসই হাসিনা সরকারের পতনের কারণ—মাহফুজ আনাম

গণমাধ্যম

Feb 2, 2026 - 11:07
 0  3
গণমাধ্যম দমনের ইতিহাসই হাসিনা সরকারের পতনের কারণ—মাহফুজ আনাম
মাহফুজ আনাম , ফাইল ছবি

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেছেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বর্তমানে এক ধরনের গভীর ও সর্বব্যাপী ভয়ের পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষায়, কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া অবস্থান থেকে সামান্য ভিন্ন কিছু বললেই সাংবাদিক বা প্রতিষ্ঠান আক্রমণের মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা এখন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আল–জাজিরার ‘দ্য লিসেনিং পোস্ট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনাম বলেন, একদিকে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিমাণও বেড়েছে। অন্যদিকে একই সঙ্গে সাংবাদিকদের মনে কাজ করছে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্ক—কোনো পক্ষের মনোভাবের বাইরে গেলেই হামলার শিকার হওয়ার ভয়।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় সাংবাদিকদের শব্দচয়ন নিয়েও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, কোনটা এড়িয়ে চলতে হবে—এ ধরনের আত্মসংযম স্বাধীন সাংবাদিকতার মৌলিক চেতনার পরিপন্থী হলেও বাস্তবতায় তা মেনে চলতে হচ্ছে।

ডেইলি স্টার ভবনে হামলার প্রসঙ্গ টেনে মাহফুজ আনাম বলেন, যারা সরাসরি হামলা চালিয়েছে এবং ভবনে আগুন দিয়েছে, তারা এই পত্রিকার নিয়মিত পাঠক নয়। তার মতে, এই হামলা ছিল পরিকল্পিত এবং এর পেছনে রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থ জড়িত ছিল। পাশাপাশি বহুমত, ভিন্নমত ও উদার সাংবাদিকতার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে দুর্বল করে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, কোনো প্রতিবেদনে ভুল থাকলে তা নিয়ে সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু একটি সংবাদমাধ্যম ধ্বংস করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হামলার রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম জানান, ওই রাতে ভবনের ভেতরে আটকে পড়া কর্মীদের শ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল। ফোনে নিউজরুমের সঙ্গে যোগাযোগের সময় তারা বলছিলেন, হয়তো আর একে অপরের সঙ্গে দেখা হবে না। অনেকেই সেই মুহূর্তে পরিবার ও স্বজনদের ফোন করে শেষবারের মতো কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের বড় একটি ক্ষেত্র এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তবে এর নেতিবাচক দিক হিসেবে ভুয়া তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগের বিস্তারও ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ এবং হেয় করার প্রবণতা বেড়েছে, যা কিছু রাজনৈতিক দল সংগঠিতভাবেই কাজে লাগাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মাহফুজ আনাম বলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কিছু বললেই মুহূর্তের মধ্যে সমন্বিতভাবে গালাগাল শুরু হয়, আবার প্রশংসামূলক কিছু বললে প্রশংসার বন্যা বইয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের রাজনৈতিক আচরণ এখন নিয়মিত চিত্র।

তিনি দাবি করেন, ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার কোনোটি প্রমাণিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বক্তব্যকে প্রেক্ষাপটের বাইরে তুলে ধরে উপস্থাপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি ছিল দুটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার একটি কৌশল।

গণমাধ্যমের ওপর জনআস্থা কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক সমাজ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেউ কোনো একটি দলের ঘনিষ্ঠ, কেউ অন্য দলের। এতে করে পাঠক ও দর্শকের কাছে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টানা তিনটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার অভিজ্ঞতার পর জনগণ এখন আরেকটি নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। এবার মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি এবং তারা একটি গ্রহণযোগ্য ও সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন দেখতে চায়।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের উচিত আগের সরকারের পতনের কারণগুলো মনে রাখা। তার মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের অন্যতম কারণ ছিল দমনমূলক শাসনব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ।

হাসিনা শাসনামলের শেষ ১৫ বছরকে এক কথায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনই সেই সময়ের প্রতীক। এই আইন ভিন্নমত দমনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য পোস্টের কারণে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কার্টুনিস্ট, শিক্ষক ও লেখকদের। পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত মামলা ও হয়রানি চালানো হয়েছে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা করা হয়েছে, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে হত্যা মামলার অভিযোগ। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে গণমাধ্যমগুলোর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সংসদে দাঁড়িয়ে তাকে আক্রমণ করেছেন।

মাহফুজ আনাম আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ সরকারগুলো অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবে এবং বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরাপদ গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0