বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে আর কীভাবে হবে?

কী বলছে সংবিধান?

Feb 19, 2026 - 14:33
Feb 19, 2026 - 14:33
 0  3
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে আর কীভাবে হবে?
তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও ইতোমধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার যাত্রা শুরু করার পর রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসবে কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

বর্তমান রাষ্ট্রপতির অবস্থান

মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বহাল রয়েছে। ফলে সাংবিধানিকভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ নেই, যদি না তিনি পদত্যাগ করেন বা অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত হন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি উঠলেও বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং তার কাছেই নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শপথ গ্রহণ করেন।

তবে গত ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্স-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানান, নির্বাচনের পর তিনি দায়িত্ব ছাড়তে আগ্রহী। তিনি বলেন, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা উচিত বলেই তিনি পদে বহাল আছেন।

পদ শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক বিধান

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে তিনভাবে—মেয়াদ শেষ হওয়া, পদত্যাগ অথবা অভিশংসন। আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। পদ শূন্য হলে তবেই নতুন নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া যায়।

রাষ্ট্রপতি যদি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন, তাহলে অভিশংসনের প্রয়োজন হবে না। সংসদ সদস্যদের শপথের পর নতুন স্পিকার দায়িত্ব নেবেন। সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে জল্পনা থাকলেও, আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া

সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি এ পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন না।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটে একজন প্রার্থী নির্বাচিত হন। প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। নির্বাচন পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, যিনি ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে তফসিল ঘোষণা করা হয়।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষের আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি পদে যদি একমাত্র প্রার্থী থাকেন, তবে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না।

১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার পর সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান বাতিল হয়। বর্তমানে সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সংস্কার প্রস্তাব

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ সময়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক হলেও রাজনৈতিক সংকট বা সংসদ ভেঙে গেলে তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে প্রণীত জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এসব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।

নতুন সরকার ও সংসদ সদস্যরা দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসতে পারে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ অব্যাহত থাকা এবং আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কবে বসবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। সেই অধিবেশনের আগে রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0