ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র
আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই নতুন কৌশল
যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সিরিয়া থেকে তাদের অবশিষ্ট সেনাদের বড় একটি অংশ সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হোয়াইট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ওই কর্মকর্তা জানান, সিরিয়ার অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নেতৃত্ব এখন দেশটির সরকারই দিতে সক্ষম। ফলে সেখানে ‘বৃহৎ পরিসরে’ মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আর প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। বর্তমানে সিরিয়ায় প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
২০১৫ সাল থেকে উপস্থিতি
২০১৫ সাল থেকে ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস)-এর প্রভাব মোকাবিলায় মার্কিন সেনারা সিরিয়ায় মোতায়েন রয়েছে। স্থানীয় মিত্র বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গি সংগঠনটির ঘাঁটি ধ্বংস এবং নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনর্দখলে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং আইএসআইএসের সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসন তাদের কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে।
ইরান উত্তেজনার মাঝেই সিদ্ধান্ত
এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদারের পদক্ষেপ নিয়েছেন। হোয়াইট হাউজ সূত্র জানায়, সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার একটি “শর্তসাপেক্ষ রূপান্তর প্রক্রিয়া”-র অংশ। পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত থাকবে।
বিমানবাহী রণতরীর অবস্থান
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বিমানবাহী রণতরী USS Abraham Lincoln বর্তমানে ইরানের নিকটবর্তী এলাকায় মোতায়েন রয়েছে। এতে গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ও একাধিক যুদ্ধবিমান যুক্ত আছে। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি USS Gerald R. Ford-কেও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে, যা শিগগিরই সেখানে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়েও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সিরিয়ায় ঘাঁটি ত্যাগ
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের আল-তানফ গ্যারিসন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আল-শাদ্দাদি ঘাঁটি ত্যাগ করেছে। ২০২৪ সালে আসাদ সরকারের পতন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
বর্তমানে ওয়াশিংটন দামেস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা সম্প্রতি হোয়াইট হাউজ সফর করেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন—যা সিরিয়ার কোনো নেতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কুর্দি বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা
সিরিয়ার সরকার জানুয়ারিতে কুর্দি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেসের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। এ চুক্তির আওতায় বাহিনীটিকে জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই এই বাহিনীকে আইএসবিরোধী লড়াইয়ে সমর্থন দিয়ে আসছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
নিরাপত্তা হুমকি এখনো বিদ্যমান
ডিসেম্বরে এক আইএস বন্দুকধারীর হামলায় একজন দোভাষী ও আইওয়া ন্যাশনাল গার্ডের দুই সদস্য নিহত হন বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন হকআই স্ট্রাইক’ নামে আইএসের বিরুদ্ধে একাধিক হামলা চালায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ হলেও, অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে শেষ হচ্ছে না। বরং সরাসরি মাটিতে সেনা মোতায়েন কমিয়ে নৌ ও বিমান শক্তির মাধ্যমে প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় রাখার দিকেই ঝুঁকছে ওয়াশিংটন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শক্তির ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে—তা এখন দেখার বিষয়।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0