মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই লেবানন সরকার দেশটিতে হেজবুল্লাহ–র সব ধরনের সশস্ত্র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের নীতির বাইরে গিয়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী স্বাধীনভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবে না। তবে সংগঠনটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
রকেট হামলার পর সিদ্ধান্ত
সোমবার ইসরায়েলের দিকে হেজবুল্লাহর রকেট হামলার পরপরই এই সিদ্ধান্ত আসে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, লেবাননের অবস্থান স্পষ্টভাবে সংঘাতবিরোধী; সেখানে সরকারের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই এ ধরনের হামলা চালানো হয়েছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই বলেছেন, এমন পদক্ষেপ দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিরাপত্তা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে।
সমান্তরাল ক্ষমতার প্রশ্নে বড় মোড়
দীর্ঘদিন ধরেই লেবাননে একটি জটিল বাস্তবতা বিদ্যমান—একদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, অন্যদিকে হেজবুল্লাহর নিজস্ব সশস্ত্র শক্তি। এই “সমান্তরাল ক্ষমতা” কাঠামো দেশটির রাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে এসেছে। সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সেই কাঠামোয় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। কারণ সাম্প্রতিক সংঘাত সত্ত্বেও হেজবুল্লাহ এখনো সশস্ত্র ও সংগঠিত অবস্থায় রয়েছে, এবং দেশের নির্দিষ্ট অংশে তাদের শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি আছে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
এদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, লেবাননের ভেতরে হেজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে তারা হামলা চালাচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাল্টাপাল্টি হামলার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, লেবাননের ভেতর থেকে যেকোনো আক্রমণের জবাব দেওয়া হবে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে হেজবুল্লাহ
সরকার স্পষ্ট করেছে, হেজবুল্লাহ রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে। লেবাননের পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভায় দলটির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ফলে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে কেবল সশস্ত্র অংশকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো বাস্তবে কতটা আলাদা করে দেখা সম্ভব? সংগঠনটির নেতৃত্ব এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সামনে কী?
লেবাননের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—দুই চ্যালেঞ্জই সমানভাবে সামনে এসেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা কতটা দৃঢ় হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লেবাননের এই পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে শান্ত করবে, নাকি নতুন করে অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত সংঘাতের জন্ম দেবে—তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক গতিপ্রকৃতির ওপর।