ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতের বিস্ফোরণ:পাল্টাপাল্টি হামলা ও আকাশপথ অচল
এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন বলে ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন; পরে তেহরানও রাষ্ট্রীয়ভাবে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা অঞ্চলে নজিরবিহীন সামরিক পাল্টাপাল্টি আঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আকাশপথ বন্ধের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ওয়াশিংটনের বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, “অপারেশন এপিক ফিউরি” নামের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হবে এবং সামরিক বাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করলে দায়মুক্তি পেতে পারে—অন্যথায় “নিশ্চিত মৃত্যুর” মুখোমুখি হতে হবে।
অভিযানের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে তেহরানকে নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিল ওয়াশিংটন। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
তেহরানে বিস্ফোরণ, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় হামলা
শনিবার ভোর থেকে রাজধানী তেহরানসহ কারাজ, ইসফাহান, কওম ও কেরমানশাহে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তা দেখা গেছে।
হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সামরিক বিমানঘাঁটি। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান পশ্চিম ও মধ্য ইরানে ‘ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলায়’ অংশ নেয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের “অস্তিত্বগত হুমকি” নিরসনেই এই অভিযান শুরু হয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, দেশজুড়ে দুই শতাধিক নিহত এবং সাত শতাধিক আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের একটি স্কুলে বিস্ফোরণে অন্তত ১৫৩ জন নিহত হওয়ার খবরও এসেছে। তবে ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাল্টা জবাব: উপসাগরীয় ঘাঁটি ও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র
সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর ইরান দ্রুত পাল্টা হামলা শুরু করে। ইসরায়েল, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়।
ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরে একটি সিনাগগ ধ্বংস হয়ে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রায় ৪৫০ জন আহত হয়েছেন বিভিন্ন হামলায়। উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ জানিয়েছে, তারা বহু ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে, তবে ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন নৌঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় অগ্নিকাণ্ডের খবর মিলেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, এই সংঘাতে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারে শঙ্কা
ইরানের বিপ্লবী গার্ড উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিশ্বে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, লোহিত সাগর, উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে অতিরিক্ত নৌ-উপস্থিতি জোরদার করা হবে।
ইরান তিনটি তেলের ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের কথাও জানিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন
খামেনির মৃত্যুর পর আলিরেজা আরাফিকে অন্তর্বর্তীকালীন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। ইরানে সর্বোচ্চ নেতা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না; ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ এই দায়িত্ব পালন করে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থায়ী নেতৃত্ব বাছাই প্রক্রিয়া নিরাপত্তাজনিত কারণে জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আকাশপথ বন্ধ, ভ্রমণে বড় বিপর্যয়
সংঘাতের জেরে হাজার হাজার ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির পর এটিকে বৈশ্বিক ভ্রমণে সবচেয়ে বড় বিঘ্নগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান, ইরাক ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত আংশিকভাবে আকাশসীমা সীমিত করেছে।
উইজ এয়ার, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, সুইস ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইন্স, লুফথানসা গ্রুপ, ইমেরেটস, এয়ার ইন্ডিয়া, ভার্জিন আটলান্টিক ও তার্কিশ এয়ারলাইন্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তেল আবিব, তেহরান, দুবাই, আবুধাবি, আম্মান, বৈরুত ও অন্যান্য গন্তব্যে ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে। ইরান বলছে, তারা “অগ্রাসীদের উপযুক্ত জবাব” দেবে; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও তাদের অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে শুরু হওয়া এই সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নেবে, নাকি আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে থামবে—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর।
বিশ্ব সম্প্রদায় উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; কারণ এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0