আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ভিডিও ঘিরে ভারতজুড়ে তীব্র বিতর্ক
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে ঘিরে প্রকাশিত একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, তিনি একটি রাইফেল হাতে নিয়ে মুসলিমদের মতো পোশাক পরা দুই ব্যক্তির ছবির দিকে নিশানা করে গুলি ছুড়ছেন। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পরই বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে কংগ্রেস, এটিকে ঘৃণামূলক ও ভয়ংকর বার্তা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ–এর খবরে বলা হয়েছে, ভিডিওটি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিজেপির আসাম প্রদেশের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়। পরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একটি দেয়ালে টাঙানো দুটি ছবির দিকে বন্দুক তাক করে গুলি করছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। ছবিগুলোর একটিতে টুপি পরিহিত এবং অন্যটিতে দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তিকে দেখা যায়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘পয়েন্ট ব্ল্যাংক শট’। একই সঙ্গে দেয়ালে বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘No Mercy’ বা ‘কোনো দয়া নয়’। এই দৃশ্য ও ভাষা ঘিরেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ভিডিওটির কড়া সমালোচনা করে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি ভেণুগোপাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এটি সরাসরি গণহত্যার আহ্বান। তার ভাষায়, একটি ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে যে চিন্তাধারা লালন করে এসেছে, এই ভিডিও তারই প্রকাশ। তিনি বলেন, বিষয়টিকে কোনো সাধারণ বা নিরীহ ভিডিও হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ ক্ষমতার শীর্ষস্থান থেকেই এ ধরনের বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এ ঘটনায় বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপও দাবি করেন তিনি।
কংগ্রেসের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকেও এই ভিডিওর নিন্দা জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, বিজেপির আসাম প্রদেশের অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘পয়েন্ট-ব্ল্যাংক’ গুলিকে ন্যায্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও আতঙ্কজনক। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ট্রোল কনটেন্ট নয়; বরং সংগঠিতভাবে ঘৃণা ছড়ানোর এবং গণহত্যার আহ্বানের শামিল বলে মন্তব্য করা হয়।
কংগ্রেসের পোস্টে আরও দাবি করা হয়, এই ভিডিও বিজেপির ফ্যাসিস্ট রাজনীতির প্রকৃত চেহারা তুলে ধরেছে। দলটির মতে, গত কয়েক দশক ধরে এই ঘৃণার রাজনীতি লালন করা হচ্ছে এবং গত ১১ বছরে তা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়েছে। সামাজিক বিভাজন ও বিদ্বেষ ছড়ানোর এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে কংগ্রেসের মুখপাত্র শামা মোহাম্মদও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি এক্সে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘সবার সঙ্গে সবার উন্নয়ন ও বন্ধুত্বের’ কথা বললেও তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন মুখ্যমন্ত্রী মুসলমানদের লক্ষ্য করে গুলি করার ভিডিও তৈরি করে তা দলের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করছেন। তার মতে, এটি ভারতের সংবিধানের ওপর সরাসরি আঘাত। একই সঙ্গে তিনি সুপ্রিম কোর্টের নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
শিবসেনার (ইউবিটি) সংসদ সদস্য প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদীও বিজেপির বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, নির্বাচন কমিশন এমন ভয়াবহ ঘৃণা ও রাজনৈতিকভাবে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি উপেক্ষা করবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তার মন্তব্যে, বিজেপির সামনে নির্বাচন কমিশন কার্যত মর্যাদাহীন ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
এ ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এই একই ব্যক্তি অতীতে সংখ্যালঘুদের হয়রানি করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা তখন ‘ছোটখাটো নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই নিষ্ঠুরতা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের মতে, বিজেপি এখন আর ইঙ্গিতের ভাষায় কথা বলছে না; প্রকাশ্যেই সহিংসতা ও ঘৃণার বার্তা দিচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
ভিডিওটি ঘিরে দেশজুড়ে চলমান এই বিতর্ক ভারতের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।